
অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন, অনিয়মের সত্যতা উদ্ঘাটনে রেলওয়ের উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে প্রথম শ্রেণির ট্রেনের কোচের বেড-বেডিং ধোলাই ও ইস্ত্রির কাজে প্রায় ৬৫ লাখ টাকার দরপত্রে জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তে উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালকের (ডিজি) উদ্যোগে তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, জাল কাগজপত্র ব্যবহার এবং কার্যাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলাম।
জানা গেছে, গত ২৮ অক্টোবর তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। তদন্তের নির্ধারিত সময়সীমা নিয়েও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
দরপত্রের নথি অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির কোচের বেডিং ধোলাই ও ইস্ত্রির কাজের জন্য গত ২ জুলাই দরপত্র খোলা হয়। এতে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’ ৬২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা এবং ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ ৬৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকার দরপত্র জমা দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও এসএলটি পদ্ধতির দোহাই দিয়ে ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’কে বাদ দেওয়া হয়। পরে প্রায় ৩ লাখ টাকা বেশি মূল্যে ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’কে কাজ দেওয়া হয়। দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য ও ঠিকানা সরেজমিন যাচাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন বাণিজ্যিক দপ্তরের তৎকালীন জেটিআই এনামুল হক শিকদার।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর দরপত্রে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’-এর মালিক মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগের সূত্র ধরে সরেজমিন অনুসন্ধানে ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’-এর দেওয়া ঠিকানায় ‘ফ্রেশ ওয়াশ সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক বিষ্ণু পাল আকাশ জানান, তিনি জায়গার মালিক কে এম মামুন রাজার কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম স্টেশন কলোনির মিঠুন নামে এক ব্যক্তি ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সময় ধোলাইয়ের কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে মালিকের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় আড়াই লাখ টাকা নেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা ব্যবহার করে ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’-এর নামে জাল চুক্তিনামা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জাল করার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মিঠুনের সঙ্গে ‘ভাই ভাই শালকর’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এ ছাড়া ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ নামে কার্যাদেশ নেওয়া হলেও ধোলাই ও ইস্ত্রির কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানে সম্পন্ন করার অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয় তদন্ত কমিটির মাধ্যমে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে জালিয়াতির অভিযোগ সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এনামুল হক শিকদারকে লাকসামে জুনিয়র ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টি) হিসেবে বদলি করা হয়েছে। তাঁর স্থলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মো. মহিউদ্দিন পাটোয়ারীকে।
এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ‘ভাই ভাই লন্ড্রি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ধোলাইয়ের কার্যাদেশ বাতিল করেছিল বিভাগীয় বাণিজ্যিক দপ্তর। নিজস্ব কারখানায় কাজ করার শর্ত থাকলেও রেলের জায়গা দখল করে ধোলাই কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ ছিল প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, দ্রুত রিপোর্ট দিতে বলেছি।’
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কত দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে, ঠিক এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না।’
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে দরপত্রসংক্রান্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এ উদ্যোগে ৬৫ লাখ টাকার দরপত্র ঘিরে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।
সম্পাদক : হাবিবুর রহমান। প্রকাশক:মাজহারুল ইসলাম। মোবাইল:01308777777
এড্রেস হবে :Apollo Shopping Centre, 3rd floor 32/3, Chattogram 4000
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬