সাত কর্মদিবস পার হলেও জমা পড়েনি তদন্ত প্রতিবেদন, তদন্তের সময়সীমা নিয়েও ধোঁয়াশা.
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রথম শ্রেণির ট্রেনের কোচের বেড-বেডিং ধোলাই ও ইস্ত্রির কাজের ৬৫ লাখ টাকার দরপত্রে জালিয়াতির অভিযোগের তদন্তে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের পর প্রায় সাত কর্মদিবস পার হতে চললেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার (সিসিএম) দপ্তরে। এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমার নির্ধারিত সময়সীমা নিয়েও দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা।
এ ধরনের অভিযোগ তদন্তে সাধারণত সাত কর্মদিবস পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। তবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ঠিক কত দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা জানেন না বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলাম।
জানা গেছে, গত ২৮ অক্টোবর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগটি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। সে হিসাবে বৃহস্পতিবার সাত কর্মদিবস পূর্ণ হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন আটকে দিতে একটি চক্র বিভিন্ন দপ্তরে তদবির চালিয়ে যাচ্ছে।
রেলওয়ের বিভাগীয় বাণিজ্যিক দপ্তর প্রথম শ্রেণির কোচের বেডিং ধোলাই ও ইস্ত্রির কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। গত ২ জুলাই দরপত্র খোলা হলে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়। বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’ ৬২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা এবং ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ ৬৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকার দরপত্র জমা দেয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও এসএলটি পদ্ধতির দোহাই দিয়ে ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’কে বাদ দেওয়া হয়। পরে প্রায় ৩ লাখ টাকা বেশি ব্যয়ে ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’কে কাজ দেওয়া হয়। দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য ও ঠিকানা সরেজমিন যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন বাণিজ্যিক দপ্তরের তৎকালীন জেটিআই এনামুল হক শিকদার।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর দরপত্রে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন ‘প্রসিদ্ধ মদিনা শালকর’-এর মালিক মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।
অভিযোগের সূত্র ধরে সরেজমিন অনুসন্ধানে ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’-এর দেওয়া ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। দরপত্রে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে পশ্চিম মাদারবাড়ি, যুগিচাঁদ মসজিদ লেন, ২ নম্বর গলি। তবে সেখানে ‘ফ্রেশ ওয়াশ সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী বিষ্ণু পাল আকাশ জানান, তিনি জায়গার মালিক কে এম মামুন রাজার কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ব্যবসা করছেন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, চট্টগ্রাম স্টেশন কলোনির মিঠুন নামে এক ব্যক্তি প্রায় দুই মাস আগে ফ্রেশ ওয়াশ সেন্টারে চাকরি নেন। সেখানে কাজ করার সময় ধোলাইয়ের কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিকের কাছ থেকে প্রায় আড়াই লাখ টাকা নেন তিনি। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ব্যবহার করে ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জাল চুক্তিনামা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জাল করে রেলের দরপত্রে অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, মিঠুন মূলত ‘ভাই ভাই শালকর’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম স্টেশন কলোনির আইস ফ্যাক্টরি রোডে পুলিশ ব্যারাকের পেছনে রেলের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’-এর নামে কার্যাদেশ নেওয়া হলেও ধোলাই ও ইস্ত্রির কাজ মূলত ওই ‘ভাই ভাই শালকর’ প্রতিষ্ঠানেই করা হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এ ছাড়া শাহ আমানত ও জান্নাত ট্রেডিং নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী শহীদ ওরফে ‘কানা শহীদ’-এর বিরুদ্ধেও ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’-এর নামে জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে কাজ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ‘এ আর কনস্ট্রাকশন’ ফাতেমা বেগম নামে এক নারীর নামে পাবনা থেকে নিবন্ধিত। তবে প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম থেকে শহীদ নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জালিয়াতির অভিযোগ সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা মো. এনামুল হক শিকদারকে বদলি করা হয়েছে। তাঁকে জুনিয়র ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টি) হিসেবে লাকসামে পদায়ন করা হয়েছে। তাঁর স্থলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মো. মহিউদ্দিন পাটোয়ারীকে। তবে বদলির আদেশে এনামুল হক শিকদারকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পোর্ট-চট্টগ্রামেও দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘ভাই ভাই লন্ড্রি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ধোলাইয়ের কার্যাদেশ বাতিল করেছিল বিভাগীয় বাণিজ্যিক দপ্তর। অভিযোগ ছিল, নিজস্ব কারখানায় কাজ করার শর্ত থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি রেলের জায়গা দখল করে সেখানে ধোলাই কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলাম বলেন, “তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, দ্রুত রিপোর্ট দিতে বলেছি।”
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য কত দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কত দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে, ঠিক এ মুহূর্তে মনে পড়ছে না।”

